পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায়

পাইলস থেকে চিরতরে মুক্তির উপায়

পাইলস রোগ থেকে চিরতরে মুক্তির বিষয়টিকে আমি কয়েকটি ভাগে ভাগ করব।

১। যাদের এখনও পাইলস হয়নি; তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছু নিয়মাবলী মেনে চলার ভিতর সীমাবদ্ধ। এসব নিয়ম মেনে চললে আশা করা যায় তিনি পাইলস থেকে দূরে থাকবেন।

২। যাদের ইতোমধ্যে পাইলস রোগ হয়ে গেছে, তাদের ক্ষেত্রে পাইলসের চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মাবলীও মেনে চলতে হবে। নতুবা আবার পাইলস দেখা দিতে পারে।

৩। যাদের পাইলস অপারেশন হয়ে গেছে তাদেরকেও নিয়মাবলী মেনে চলতে হবে।

পাইলস কি?

পাইলস বলতে মানুষ মলদারের যে কোন সমস্যাকেই বুঝিয়ে থাকে। কিন্তু ডাক্তারী ভাষায় পাইলস বলতে hemorrhoid নামের একটি নিদিষ্ট রোগকেই বুঝানো হয়। মলদারে পাইলস ছাড়াও এনাল ফিসার, ফোড়া, ফিস্টুলা ,পলিপ, ক্যান্সার ইত্যাদি রোগ হয়ে থাকে। পাইলস রোগে মলদারের ভিতরে  রক্তনালীর একটি পিন্ড ফুলে যায় ও কখনো কখনো বাইরে বের হয়ে আসে।

পাইলস বা হেমোরয়েড এর লক্ষণ সমূহঃ

প্রধান লক্ষণ হচ্ছে মলদার হতে রক্তপাত (লাল রক্ত ফোটায় ফোটায় বা তীরের মতো ছুটতে পারে), মলত্যাগের সময় বোটের মতো কিছু বের হয়ে আসা ও মলদারে চুলকানি। পাইলস রোগ জটিলতা ধারণ না করলে  মলদারে কোন ব্যাথা হয় না; তবে জটিলতা যেমন রক্ত জমাট বেধে ফুলে গেলে তীব্র ব্যথা হতে পারে।

পাইলস বা হেমোরয়েড কি কি কারণে হতে পারেঃ

দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য বা পাতলা পায়খানা, অধিক সময় ধরে মলত্যাগ ও মল ত্যাগে বেশী চাপ দেয়া, শাক সবজি ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার ও পানি কম খাওয়া এবং লাল মাংশ, ফাস্ট ফুড, ও চর্বি জাতীয় খাবার বেশী খাওয়া পাইলস রোগের ঝুকে বাড়ায়। এছাড়া শরীরের অতিরিক্ত ওজন, গর্ভাবস্থা, বংশগত ও বয়সজনিত কারণেও পাইলস হতে পারে।

পাইলস বা হেমোরয়েড রোগের থেকে দূরে থাকার জন্য যেসব নিয়মাবলী মানতে হবেঃ

·   সঠিক খাদ্যাভ্যাসঃ অত্যন্ত জরুরী। বেশি করে পানি ও আশযুক্ত খাবার (শাক-সবজি, ইসবগুলের ভূষি ও পাকা বেল) খেতে হবে। লাল মাংস (যেমন গরু, খাশী) ও চিংড়ী বেশী খাওয়া যাবে না।

·   সঠিক পায়খানার অভ্যাসঃ বেশি সময় ধরে ও অতিরিক্ত কোৎ দিয়ে মলত্যাগের অভ্যাস বাদ দিতে হবে। সম্পূর্ণ রিল্যাক্স অবস্থায় কোৎ দিবেন। পাচ মিনিটের বেশী সময় ধরে কোতাকুতি করা যাবে না। মল শক্ত হলে মল নরম করার ঔষধ খেতে হবে।  একই ভাবে ডায়রিয়া হলে তার চিকিৎসাও নিতে হবে। কারো যদি দুই সপ্তাহের বেশী সময় ধরে পায়খানার অভ্যাস উল্টা-পাল্টা থাকে, তাকে কলোরেক্টাল সার্জারীর ডিগ্রীপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে বিষষয়টির সমাধান করতে হবে। যারা কমোডে বসে পায়খানা করেন, তারা পায়ের নীচে একটি নীচু টুল দিয়ে বসলে ভালো। বাথরুমে বসে পেপার পড়া ও মোবাইল দেখার অভ্যাস চিরতরে ঝেড়ে ফেলতে হবে।

·   ব্যায়াম করাঃ সপ্তাহে ৫-৬ দিন আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা ব্যায়াম করা ভালো। হালকা ব্যায়াম যেমন জোরে হাটা, আস্তে দৌড়ানো, সাতার কাটার পাশাপাশি কিছু পেলভিক ফ্লোর রিল্যাক্স করা যোগ ব্যায়ামও করা যেতে পারে। যন্ত্রপাতির সাহায্যেও ব্যায়াম করা যেতে পারে তবে ভারী ওজন বহন করে ব্যায়াম করা পাইলসের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

·   কাশি থাকলে তার চিকিৎসা করাঃ দীর্ঘ দিন ধরে কাশি থাকা পাইলসের জন্য খুবই ক্ষতিকারক।

·   ভারী ওজন বহন পরিহার করা।

·   প্রেগনেন্সীঃ গর্ভকালীন সময়ে পাইলস বাড়ে। তাই কোন মহিলা পাইলসে ভুগলে গর্ভধারণ করার আগেই তার পাইলসের সমাধান করা উচিত; নতুবা তার গর্ভকালীন সময় দূর্বিষহ হয়ে যেতে পারে। একজন মহিলা তার সারা জীবনে যত বেশী সময় ধরে গর্ভধারণ করবেন, তার পাইলস হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশী।

·   সিজ বাথঃ বড় প্লাস্টিকের গামলায় তিন লিটার কুসুম গরম পানি নিয়ে তার ভিতর ১ টেবিল চামচ খাবার লবন মিশাবেন। তার মধ্যে মলদার ১০ মিনিট ধরে ডুবিয়ে বসে থাকবেন রোজ ২ বার। ফোলা কমে গেলে আর বসা লাগবে না।

পাইলসের ডাক্তারী চিকিতসাঃ

পাইলস চিকিতসার আগে একজন কলোরেক্টাল সার্জন দেখিয়ে অবশ্যই পলিপ বা ক্যান্সার যে নেই, তা নিশ্চিত হওয়া উচিৎ। জানতে হবে পাইলস এখন কোন স্টেজে আছে। প্রথম ডিগ্রী পাইলস চিকিতসাতেই ভাল হয়। দ্বিতীয় ডিগ্রী পাইলসের জন্য লেজার সার্জারী, রাবার ব্যান্ড/রিং লাইগেশন, ডপলার গাইডেড পাইলসের রক্তনালী বাধা অথবা ইঞ্জেকশন স্ক্লেরোথেরাপি বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসা রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসবের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া লাগে না। তৃতীয় ডিগ্রী পাইলসে লঙ্গো, লেজার, ডপলার গাইডেড পাইলসের রক্তনালী বাধা অথবা কেটে অপারেশন করার প্রয়োজন হয়। চতুর্থ ডিগ্রীতে STARR অথবা কেটে অপারেশন করা লাগে।

মলদারের লেজার চিকিৎসা ও অপারেশন

মলদারের রোগগুলো প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসাতে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ভালো হওয়া সম্ভব হলেও মানুষ সবসময় প্রাথমিক অবস্থায় আমাদের কাছে আসেনা। তাই অনেক সময় অপারেশন লাগে। কিন্তু পুরাতন পদ্ধতিতে অপারেশনের কিছু অসুবিধা আছে। যেমন বেশী ব্যাথা ও রক্তপাত হয়, সুস্থ হতে বেশী সময় লাগে ও ডাক্তারের কাছে বেশ কয়েকবার আসা লাগে। অনেক সময় মলদার সরু হয়ে যায়। এসব ভয়ে অনেকে ডাক্তারের কাছে না এসে কবিরাজের কাছে যায় এবং অপচিকিতসায় অবস্থা আরও খারাপ হয়ে থাকে। এসকল সমস্যার সমাধানে আমরা এখন ইউরোপের সবচেয়ে আধুনিক লেজার মেশিনে মলদারের অপারেশন করে থাকি। লেজারে মলদারের যেসব অপারেশন করা যায়ঃ

·       পাইলস

·       এনাল ফিসার

·       ফিস্টুলা

·       পাইলোনিডাল সাইনাস

লেজার চিকিৎসার সুবিধা সমূহঃ

·   কোন কাটাছেড়া লাগেনা

·   কোন রক্তপাত হয়না

·   নিখুত অপারেশন

·   কোন সেলাই লাগে না

·   কোন দাগ থাকে না

·   ব্যাথা খুবই কম হয়

·   হাসপাতালে মাত্র একদিন থাকা লাগে

·   তাড়াতাড়ি কাজে ফেরা যায়

·   মাত্র কয়েক মিনিটেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

পাইলসের কবিরাজী ও হাতুড়ে চিকিতসাঃ

উনারা পাইলসের চিকিৎসায় মলদারে একটি এসিডের দ্রবন লাগিয়ে থাকেন। ফলে পাইলস মলদারের চামড়াসহ খসে পড়ে যায় এবং সেখানে একটি দগদগে ঘা হয়। ঘা শুকানোর সময় মলদার ক্রমান্বয়ে সরু হতে হতে এক সময় এমন অবস্থা হয় যে, মল ত্যাগ করাই কষ্টকর হয়ে যায়। এধরণের অবস্থাকে এনাল স্ট্রিকচার বলে। এরূপ হলে তা আবার অপারেশন করে ঠিক করা লাগে। কেউ কেউ পাইলস চিকিতসায় অপারেশনের ভয়ে আবার কেউ টাকা পয়সা খরচ হবার ভয়ে হাতুড়ে চিকিৎসা নিয়ে এরূপ পরিণতি ভোগ করে থাকে। কিন্তু নির্মম সত্য এইযে হাতুড়ে চিকিৎসার ফলে শেষ পর্যন্ত টাকা আরও বেশী খরচ হয় এবং ভোগান্তিও আরো অনেক বেড়ে যায়।

পাইলস বিষেশজ্ঞ কারা?

কলোরেক্টাল সার্জন হচ্ছেন পাইলস এবং পায়ুপথ, মলাশয়, বৃহদান্ত্র ও ক্ষুদ্রান্ত্র এর সকল রোগের চিকিতসা ও অপারেশনে বিশেষজ্ঞ।ষ তারা কলোরেক্টাল সার্জারী বিষয়ের উপর এমএস ডিগ্রীপ্রাপ্ত  কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কলোরেক্টাল সার্জারী বিষয়ের শিক্ষক। বাংলাদেশে মুষ্টিমেয় কয়েক জন মাত্র এম এস কলোরেক্টাল সার্জন রয়েছেন।

উপসংহারঃ

পাইলস রোগ থেকে চিরতরে মুক্তির জন্য উপরি বর্ণিত নিয়মাবলী মেনে চলার পাশাপাশি একজন কলোরেক্টাল সার্জন দেখিয়ে দ্রুততম সময়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহন করা উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা নিলে অপারেশন ছাড়াই চিরতরে মুক্তি মেলে।

লেখক পরিচিতিঃ

ডা. তারিক আখতার খান এমবিবিএস, এফসিপিএস (সার্জারী), এমএস (কলোরেক্টাল সার্জারী),  এবং এফআরসিএস (গ্লাসগো) সম্পন্ন করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের কলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত আছেন। তিনি আমেরিকান এবং ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ কোলন এন্ড রেক্টাল সার্জনস এর সদস্য এবং আর্ন্তজাতিক কলোপ্রক্টলজী সোসাইটির ফেলো। কলোরেক্টাল সার্জারী বিষয়ক তাঁর গবেষণালব্ধ ৯টি প্রবন্ধ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৭ সালে কলোরেক্টাল বিষয়ক তার গবেষনা প্রবন্ধ ইন্ডিয়াতে প্রথম পুরস্কার অর্জন করে।

লেখক পরিচিতিঃ

ডা. তারিক আখতার খান

এমবিবিএস, এফসিপিএস (সার্জারি), এমএস (কলোরেক্টাল সার্জারি), এফআরসিএস (গ্লাসগো)।

সহযোগী অধ্যাপক, কলোরেক্টাল সার্জারি, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ।

সদস্য, আমেরিকান সোসাইটি অফ কোলন এন্ড রেক্টাল সার্জারি।

আজীবন সদস্য, ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ কোলন এন্ড রেক্টাল সার্জারি।

ফেলো ও আজীবন সদস্য, আন্তর্জাতিক কলোপ্রক্টোলজি সোসাইটি।

সিনিয়র কনসালটেন্ট, কলোরেক্টাল ও এন্ডো-লেপারোস্কপিক সার্জারি, ল্যাব এইড ক্যান্সার হাসপাতাল।

এপয়েন্টমেন্টের জন্য যোগাযোগ করুনঃ ০১৯৮৫৮৬০৬৯০, ০১৭৩৬৩৬৯৫৩৬

ডা. তারিক আখতার খান ২০০০ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ও ২০১০ সালে সার্জারীতে এফসিপিএস  ডিগ্রী অর্জন করেন। আবাসিক সার্জন হিসেবে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, কুষ্টিয়াতে ২০১০-২০১৩ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ২০১৩ সালে তিনি কনসালটেন্ট (সার্জারী) হন। ২০১৪ সাল থেকে বিএসএমএমইউ সহ ঢাকা ও ঝিনাইদহে কলোরেক্টাল সার্জন হিসেবে কাজ করেন। তিনি কলোরেক্টাল ক্যান্সারের উপর থিসিস করেছেন। ২০১৮ সালে কলোরেক্টাল সার্জারীতে এম এস ডিগ্রী অর্জন করে বর্তমানে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে কর্মরত আছেন।

কলোরেক্টাল সার্জারী বিষয়ক তাঁর গবেষণালব্ধ ৯টি প্রবন্ধ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৭ সালে কলোরেক্টাল বিষয়ক তার গবেষনা প্রবন্ধ ইন্ডিয়াতে পুরস্কার অর্জন করে।

বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা সমূহঃ

পাইলস, কোলন ক্যান্সার, রেক্টাম/মলাশয় ক্যান্সার, পলিপ, এনাল/মলদারের ক্যান্সার, ফিস্টুলা, ফোঁড়া, এনাল ফিসার, রেক্টাল প্রোলাপ্স(হালিশ), কোষ্ঠকাঠিন্য, মলত্যাগে বাধাগ্রস্ততা(ODS), ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটে ব্যাথা, আইবিএস, আলসারিটিভ কোলাইটিস, ক্রনস ডিসিস, পেটের ও মলদারের যক্ষা, বমি, পেট ফাঁপা, পেট ফোলা, বদ হজম, পেটে গ্যাস, মলদারে রক্ত যাওয়া, মলদারে ব্যাথা,পাইলোনিডাল সাইনাস ইত্যাদির চিকিৎসা।

বিনা অপারেশনে পাইলসের চিকিৎসা, লেজার চিকিৎসা, কলোনস্কপি, রাবার ব্যান্ড/রিং লাইগেশন, ইঞ্জেকশন স্কেরোথেরাপি, লঙ্গো, STARR, ফিস্টুলা সার্জারী, ল্যাপারোস্কপিক রেক্টোপেক্সি, এবডোমিনোপেরিনিয়াল রিসেকশন, এন্টেরিয়র রিসেকশন, কোলেকটমি ইত্যাদি সেবা।

Don't miss these stories