পায়ুপথে ফোড়ার চিকিৎসা:
কারণ, লক্ষণ, চিকিত্সা ও করণীয়
পায়ুপথের পাশে হঠাৎ ব্যথা, ফোলা বা শক্ত গুটির মতো কিছু অনুভব করলে অনেকেই সেটিকে সাধারণ পাইলস বা
সামান্য সংক্রমণ মনে করেন। কিন্তু ব্যথার সঙ্গে যদি জ্বর, পুঁজ, লালভাব কিংবা বসতে অসুবিধা দেখা
দেয়, তাহলে এটি পায়ুপথে ফোড়া বা অ্যানাল অ্যাবসেস হতে পারে। লজ্জা, ভয় বা অপারেশনের
আশঙ্কায় চিকিৎসা নিতে দেরি করলে সংক্রমণ আরও গভীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পায়ুপথে ফোড়া হলে কেবল ব্যথার ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে অপেক্ষা করা সব সময় নিরাপদ নয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে জমে থাকা পুঁজ বের করে দেওয়াই মূল চিকিৎসা। দ্রুত একজন দক্ষ কোলোরেক্টাল সার্জন এর পরামর্শ নিলে
ব্যথা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ফিস্টুলা বা পুনরায় ফোড়া হওয়ার মতো জটিলতার ঝুঁকিও
মূল্যায়ন করা যায়।
পায়ুপথ বা মলদ্বারের আশপাশের টিস্যুর মধ্যে সংক্রমিত পুঁজ জমে যে ফোলা গহ্বর তৈরি হয়, তাকে
অ্যানাল অ্যাবসেস বা পেরিয়ানাল অ্যাবসেস বলা হয়। এটি পায়ুপথের একেবারে পাশে ত্বকের নিচে হতে
পারে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মলদ্বারের গভীর অংশেও তৈরি হতে পারে।
পায়ুপথের ভেতরে কয়েকটি ছোট গ্রন্থি থাকে। কোনো গ্রন্থির মুখ বন্ধ হয়ে সেখানে ব্যাকটেরিয়ার
সংক্রমণ হলে ধীরে ধীরে পুঁজ জমতে পারে। বাইরে থেকে ছোট ফোলা দেখা গেলেও ভেতরের সংক্রমণ তুলনামূলক
বড় বা গভীর হতে পারে।
পায়ুপথে ফোড়ার সাধারণ লক্ষণ
ফোড়ার অবস্থান ও গভীরতার ওপর লক্ষণের ধরন ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত নিচের সমস্যাগুলো দেখা যায়—
পায়ুপথের পাশে তীব্র বা স্পন্দনের মতো ব্যথা
বসা, হাঁটা বা মলত্যাগের সময় ব্যথা বেড়ে যাওয়া
মলদ্বারের পাশে ফোলা বা শক্ত গুটি
আক্রান্ত স্থান লাল ও গরম হয়ে যাওয়া
ফোড়া থেকে পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত তরল বের হওয়া
জ্বর, কাঁপুনি বা শরীর দুর্বল লাগা
পায়ুপথের ভেতরে চাপ বা ভারী অনুভূতি
কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রস্রাব করতে অস্বস্তি
বারবার একই স্থানে ফোলা ও পুঁজ হওয়া
পায়ুপথে ফোড়া কেন হয়?
অধিকাংশ অ্যানাল অ্যাবসেস পায়ুপথের ভেতরের গ্রন্থিতে হঠাৎ সংক্রমণের কারণে তৈরি হয়। তবে কিছু
শারীরিক অবস্থা সংক্রমণ বা পুনরায় ফোড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পায়ুপথে আঘাত বা আগে করা কোনো অস্ত্রোপচারের জটিলতা
দীর্ঘমেয়াদি কিছু সংক্রমণ
হাইড্রাডেনাইটিস সাপুরেটিভার মতো ত্বকের রোগ
পাইলস, ফিশার, ফোড়া ও ফিস্টুলার পার্থক্য
পায়ুপথের বিভিন্ন রোগে ব্যথা, রক্তপাত বা ফোলা দেখা দিতে পারে। তাই রোগীরা প্রায়ই একটি সমস্যাকে
অন্যটি মনে করেন।
পাইলস: পায়ুপথের রক্তনালি ফুলে যাওয়াকে পাইলস বলা হয়। এতে সাধারণত মলত্যাগের সময়
উজ্জ্বল লাল রক্তপাত, মাংস বের হওয়া বা চুলকানি দেখা যায়।
অ্যানাল ফিশার: পায়ুপথের মুখে ছোট ফাটল বা
ক্ষত। মলত্যাগের সময় ও পরে কাটার মতো তীব্র
ব্যথা এবং অল্প রক্তপাত এর পরিচিত লক্ষণ।
অ্যানাল অ্যাবসেস: সংক্রমণের কারণে পুঁজ জমে ব্যথাযুক্ত ফোলা তৈরি হয়। এর সঙ্গে জ্বর,
লালভাব ও পুঁজ থাকতে পারে।
অ্যানাল ফিস্টুলা: পায়ুপথের ভেতর থেকে বাইরের
ত্বক পর্যন্ত অস্বাভাবিক একটি সরু পথ তৈরি
হয়। এটি প্রায়ই আগে হওয়া অ্যানাল অ্যাবসেসের পর দেখা দেয় এবং বারবার পুঁজ বের হতে পারে।
পায়ুপথের ফোড়া কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীর উপসর্গ শুনে এবং পায়ুপথের চারপাশ পরীক্ষা করেই অ্যানাল অ্যাবসেস শনাক্ত করা
যায়। চিকিৎসক আক্রান্ত স্থানের ফোলা, লালভাব, উত্তাপ, ব্যথা ও পুঁজের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
প্রয়োজন অনুসারে যেসব পরীক্ষা করা হতে পারে—
পায়ুপথ ও মলদ্বারের শারীরিক পরীক্ষা
ডিজিটাল রেক্টাল পরীক্ষা
প্রোক্টোস্কোপি বা অ্যানোস্কোপি
রক্তে সংক্রমণের লক্ষণ দেখার পরীক্ষা
আল্ট্রাসাউন্ড
সিটি স্ক্যান
পেলভিক এমআরআই
পায়ুপথে ফোড়ার চিকিৎসা কী?
পায়ুপথে ফোড়ার চিকিৎসা নির্ভর করে ফোড়ার আকার, অবস্থান, গভীরতা, সংক্রমণের মাত্রা এবং রোগীর
সামগ্রিক
স্বাস্থ্যের ওপর। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল চিকিৎসা হলো জমে থাকা পুঁজ যথাযথভাবে বের করে দেওয়া।
ইনসিশন ও ড্রেনেজ
ফোড়ার ওপর ছোট একটি কাটা দিয়ে জমে থাকা পুঁজ বের করার পদ্ধতিকে ইনসিশন অ্যান্ড ড্রেনেজ বলা হয়।
ছোট ও
ত্বকের কাছাকাছি ফোড়া কখনো কখনো স্থানীয় অবশ করার ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা যায়। গভীর, বড় বা বেশি
ব্যথাযুক্ত ফোড়ার ক্ষেত্রে অপারেশন থিয়েটারে অ্যানেসথেশিয়ার মাধ্যমে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
পুঁজ বের করার পর গহ্বরটি পরিষ্কার করা হয়। ক্ষতটি অনেক সময় সেলাই না করে কিছুটা খোলা রাখা হয়,
যাতে
ভেতরে আবার পুঁজ জমে না যায় এবং ক্ষত ভেতর থেকে ধীরে ধীরে শুকাতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক
শুধু অ্যান্টিবায়োটিক অধিকাংশ পূর্ণাঙ্গ অ্যানাল অ্যাবসেসের বিকল্প চিকিৎসা নয়। কারণ পুঁজের গহ্বর
তৈরি
হয়ে গেলে ওষুধ সব সময় সেখানে কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারে না। তবে চিকিৎসক নিচের পরিস্থিতিতে
অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন—
ফোড়ার চারপাশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে
রোগীর জ্বর বা সারা শরীরে সংক্রমণের লক্ষণ থাকলে
ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকলে
ফোড়া বড় বা জটিল হলে
চিকিৎসক অন্য কোনো ঝুঁকি শনাক্ত করলে
ফিস্টুলা থাকলে আলাদা চিকিৎসা
ফোড়ার সঙ্গে ফিস্টুলা পাওয়া গেলে শুধু পুঁজ বের করলেই সমস্যাটি স্থায়ীভাবে সমাধান নাও হতে পারে।
ফিস্টুলার অবস্থান, শাখা এবং পায়ুপথের মাংসপেশির সঙ্গে সম্পর্ক বুঝে ফিস্টুলোটমি, সেটন বা অন্য
উপযুক্ত
চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হতে পারে।
ঘরোয়া উপায়ে
পায়ুপথের ফোড়া ভালো হয় কি?
গরম পানিতে বসা বা সিটজ বাথ সাময়িকভাবে ব্যথা ও অস্বস্তি কমাতে পারে। আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার রাখা
এবং
মল নরম রাখাও কিছুটা স্বস্তি দেয়। কিন্তু এগুলো জমে থাকা পুঁজ দূর করার নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। নিচের
কাজগুলো করা বিপজ্জনক হতে পারে—
ফোড়া চেপে পুঁজ বের করার চেষ্টা
সুচ, ব্লেড বা ধারালো বস্তু দিয়ে ফোড়া ফাটানো
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া
ব্যথার ওষুধ খেয়ে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করা
কোনো অজানা মলম, রাসায়নিক বা ভেষজ পদার্থ লাগানো
পুঁজ বের হওয়ার পর সম্পূর্ণ সুস্থ মনে করে পরীক্ষা না করানো
ফোড়া ড্রেন করার পর সঠিক পরিচর্যা ক্ষত শুকাতে এবং পুনরায় সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
চিকিৎসকের নির্দেশনা রোগীভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ যত্নের মধ্যে রয়েছে—
মলত্যাগের পর হালকা পানি দিয়ে স্থানটি পরিষ্কার করা
ঘষাঘষি না করে নরম কাপড় দিয়ে শুকানো
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ড্রেসিং পরিবর্তন করা
পুঁজ বা তরল শোষণের জন্য পরিষ্কার গজ বা প্যাড ব্যবহার করা
পর্যাপ্ত পানি পান করা
আঁশযুক্ত খাবার খেয়ে মল নরম রাখা
নির্ধারিত ব্যথার ওষুধ সঠিকভাবে গ্রহণ করা
অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করা
ক্ষত না শুকানো পর্যন্ত সাঁতার বা সাইকেল চালানো এড়ানো
নির্ধারিত সময়ে ফলোআপে যাওয়া
পায়ুপথের ফোড়া থেকে কি ফিস্টুলা হতে পারে?
হ্যাঁ। অ্যানাল অ্যাবসেসের সংক্রমিত গ্রন্থি থেকে পায়ুপথের বাইরের ত্বক পর্যন্ত একটি অস্বাভাবিক পথ
থেকে
গেলে সেটি অ্যানাল ফিস্টুলায় রূপ নিতে পারে। ফোড়া ড্রেন করার পরও যদি একই স্থানে বারবার ফোলা হয়,
ছোট
ছিদ্র থেকে পুঁজ বের হয় বা ক্ষত পুরোপুরি না শুকায়, তাহলে ফিস্টুলার সম্ভাবনা থাকে।
ফিস্টুলা সাধারণত নিজে থেকে পুরোপুরি ভালো হয় না। এর অবস্থান ও জটিলতার ওপর নির্ভর করে বিশেষায়িত
চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
কখন জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে?
পায়ুপথে ফোড়ার ব্যথা, ফোলা বা সংক্রমণের লক্ষণ দ্রুত বেড়ে গেলে দেরি করা উচিত নয়। বিশেষ করে
জ্বর,
কাঁপুনি, অতিরিক্ত পুঁজ, রক্তপাত বা শরীর দুর্বল লাগলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
ব্যথা দ্রুত বাড়তে থাকা
জ্বর বা কাঁপুনি হওয়া
শরীর অত্যন্ত দুর্বল বা অসুস্থ লাগা
ফোলা ও লালভাব চারপাশে ছড়িয়ে পড়া
ডায়াবেটিসের সঙ্গে পায়ুপথে ফোলা বা পুঁজ হওয়া
প্রস্রাব করতে সমস্যা হওয়া
প্রচুর রক্তপাত
ফোড়া ফেটে যাওয়ার পরও ব্যথা বা জ্বর না কমা
বারবার একই স্থানে ফোড়া হওয়া
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা
পায়ুপথে ফোড়ার জন্য কোন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
পায়ুপথ, মলদ্বার, কোলন ও রেকটামের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় কোলোরেক্টাল সার্জন বিশেষভাবে
প্রশিক্ষিত।
অ্যানাল অ্যাবসেস গভীর হলে, বারবার দেখা দিলে বা ফিস্টুলার সন্দেহ থাকলে একজন অভিজ্ঞ কোলোরেক্টাল
সার্জনের মূল্যায়ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পায়ুপথে ফোড়ার চিকিৎসা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নত্তোর
খুব ছোট ফোড়া কখনো কখনো নিজে থেকে পুঁজ বের হয়ে সাময়িকভাবে ভালো হতে পারে। তবে
ভেতরের
সংক্রমণ বা ফিস্টুলা থেকে যেতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরীক্ষা করানো উচিত।
সব রোগীর চিকিৎসা এক নয়। তবে পুঁজের গহ্বর তৈরি হয়ে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছোট
প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুঁজ বের করে দেওয়াই কার্যকর চিকিৎসা।
শুধু অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সব অ্যানাল অ্যাবসেস ভালো হয় না। জমে থাকা পুঁজ অনেক
ক্ষেত্রে
ড্রেন করতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক লাগবে কি না, তা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
প্রক্রিয়ার সময় স্থানীয় বা সাধারণ অ্যানেসথেশিয়া ব্যবহার করা হয়। অপারেশনের পরে
কিছু
ব্যথা ও অস্বস্তি থাকতে পারে, যা সাধারণত নির্ধারিত ওষুধ ও সঠিক যত্নে ধীরে ধীরে কমে।
একই স্থানে বারবার ফোলা, ছোট ছিদ্র থেকে পুঁজ বা রক্ত বের হওয়া, ক্ষত না শুকানো এবং
মাঝেমধ্যে ব্যথা হওয়া ফিস্টুলার লক্ষণ হতে পারে।
হ্যাঁ। পুঁজ সম্পূর্ণ বের না হলে, ফিস্টুলা থাকলে অথবা ক্রোনস ডিজিজ ও ডায়াবেটিসের মতো
অন্তর্নিহিত সমস্যা থাকলে ফোড়া পুনরায় হতে পারে।
ফোড়ার আকার, গভীরতা, চিকিৎসার ধরন এবং রোগীর কাজের প্রকৃতির ওপর সময় নির্ভর করে। ছোট
প্রক্রিয়ার পর অনেক রোগী কয়েক দিনের মধ্যে হালকা কাজে ফিরতে পারেন, তবে চিকিৎসকের
নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
সতর্কতাঃ
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যসমূহ শুধুমাত্র সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
আজই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন!
পায়ুপথে ফোড়ার সঠিক ও নিরাপদ চিকিৎসার জন্য আজই অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করুন।