পাইলোনিডাল সাইনাস: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা

পিঠের নিচের দিকে, নিতম্বের মাঝের ভাঁজে ছোট একটি ফোঁড়া বা ছিদ্র। শুরুতে অনেকেই ভাবেন, সাধারণ ব্রণ বা ছোট ফোঁড়া। কিন্তু কয়েক দিন পর ব্যথা বাড়ে, বসতে কষ্ট হয়, কখনও পুঁজ বের হয়, কখনও আবার একই জায়গায় বারবার ফুলে ওঠে। এই সমস্যাটিই অনেক সময় পাইলোনিডাল সাইনাস হতে পারে।

পাইলোনিডাল সাইনাস: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসা

পাইলোনিডাল সাইনাস সাধারণত নিতম্বের মাঝের ভাঁজে, টেইলবোন বা কক্সিক্সের কাছাকাছি জায়গায় হয়। সেখানে চুল, মৃত চামড়া ও সংক্রমণ জমে একটি ছোট গর্ত, থলি বা সুড়ঙ্গের মতো পথ তৈরি করতে পারে। পাইলোনিডাল সিস্ট সাধারণত ত্বকের একটি অস্বাভাবিক পকেট, যেখানে চুল ও skin debris থাকতে পারে এবং এটি প্রায় সবসময় নিতম্বের ওপরের ভাঁজের কাছে দেখা যায়। সুস্থ জীবন যাপনের জন্য আমাদের এসব বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। এই ব্লগে আলোচনা করব, পাইলোনিডাল সাইনাসের লক্ষণ, কারণ ও সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে।

পাইলোনিডাল সাইনাস কী?

পাইলোনিডাল শব্দের অর্থই হলো “চুলের বাসা” জাতীয় ধারণা। সহজভাবে বললে, নিতম্বের মাঝের ভাঁজে চুল ঢুকে বা আটকে গিয়ে সেখানে প্রদাহ, পুঁজ, ফোঁড়া বা সাইনাস ট্র্যাক্ট তৈরি করতে পারে। কখনও এটি শুধু ছোট ছিদ্র হিসেবে থাকে। আবার কখনও সংক্রমিত হয়ে তীব্র ব্যথা, ফুলে যাওয়া ও পুঁজ বের হওয়ার কারণ হয়।

এটি মলদ্বারের রোগ মনে হলেও, আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি মলদ্বারের ভেতরের রোগ নয়। জায়গাটি মলদ্বারের কাছাকাছি হওয়ায় অনেক রোগী পাইলস, ফিস্টুলা বা ফোঁড়া ভেবে ভুল করেন। তাই সঠিক রোগ নির্ণয় জরুরি।

পাইলোনিডাল সাইনাসের লক্ষণ

পাইলোনিডাল সাইনাস শুরুতে খুব ছোট একটি ছিদ্র, ফোঁড়া বা অস্বস্তি দিয়ে দেখা দিতে পারে। অনেক সময় ব্যথা না থাকায় রোগী বিষয়টি গুরুত্ব দেন না, কিন্তু সংক্রমণ হলে একই জায়গা ফুলে ওঠে, বসতে কষ্ট হয় এবং পুঁজ বা রক্তমিশ্রিত তরল বের হতে পারে। লক্ষণগুলো একেক রোগীর ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কারও সমস্যা হঠাৎ তীব্র হয়, আবার কারও দীর্ঘদিন ধরে বারবার একই জায়গায় ফোঁড়া বা স্রাবের সমস্যা দেখা দেয়।

সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

  • নিতম্বের মাঝের ভাঁজে ছোট ছিদ্র বা গর্ত দেখা যাওয়া
  • একই জায়গায় বারবার ফোঁড়া হওয়া
  • বসলে বা হাঁটলে ব্যথা
  • জায়গাটি ফুলে যাওয়া, লাল হওয়া বা গরম লাগা
  • পুঁজ বা রক্তমিশ্রিত তরল বের হওয়া
  • দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব
  • কাপড়ে দাগ লাগা
  • চুলকানি বা অস্বস্তি
  • সংক্রমণ বেশি হলে জ্বর বা শরীর খারাপ লাগা

পাইলোনিডাল সাইনাস কেন হয়?

একটি নির্দিষ্ট কারণ সব রোগীর ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। তবে বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ধারণা হলো, নিতম্বের ভাঁজে ঢিলা চুল বা ভাঙা চুল ত্বকের ভেতরে ঢুকে যায়। এরপর শরীর সেই চুলকে বিদেশি বস্তু হিসেবে দেখে প্রদাহ তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে সেখানে পুঁজ, ফোঁড়া বা সাইনাস ট্র্যাক্ট তৈরি হতে পারে। এখানে শুধু চুল নয়; ঘর্ষণ, চাপ, ঘাম, বসে থাকা, শরীরের গঠন এবং ত্বকের পরিচর্যার বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে।

কিছু মানুষের পাইলোনিডাল সাইনাস হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। যেমন:

  • শরীরে ঘন বা মোটা চুল থাকা
  • দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা
  • অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
  • নিতম্বের ভাঁজ গভীর হওয়া
  • ওজন বেশি থাকা
  • জায়গাটি বারবার ঘষা লাগা
  • ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার ঘাটতি
  • আগে একই জায়গায় ফোঁড়া বা পুঁজ হওয়া
  • পরিবারের অন্য কারও এমন সমস্যা থাকা

পাইলোনিডাল সাইনাস অবহেলা করলে কী হতে পারে?

প্রথমে ছোট মনে হলেও, অবহেলা করলে সমস্যা বারবার ফিরে আসতে পারে। সংক্রমণ হলে abscess বা পুঁজের থলি তৈরি হতে পারে। একাধিক ছিদ্র, সুড়ঙ্গ বা chronic discharge হতে পারে। এতে বসা, হাঁটা, অফিস করা, পড়াশোনা বা দৈনন্দিন জীবন বিরক্তিকর হয়ে যায়।

দীর্ঘদিন ধরে বারবার সংক্রমণ থাকলে চিকিৎসা জটিল হতে পারে। যদিও পাইলোনিডাল রোগ সাধারণত benign, তবু দীর্ঘমেয়াদি untreated chronic disease বিরল ক্ষেত্রে আরও গুরুতর জটিলতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তাই বারবার পুঁজ, ব্যথা বা ছিদ্র থাকলে দেরি না করাই ভালো।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসক জায়গাটি দেখে এবং পরীক্ষা করেই রোগ নির্ণয় করতে পারেন। ছোট ছিদ্র, পুঁজের মুখ, চুল, ফোলা বা পুরনো দাগ দেখে ধারণা পাওয়া যায়।

সব রোগীর MRI বা বড় পরীক্ষা লাগে না। তবে যদি রোগটি জটিল হয়, অনেকগুলো ছিদ্র থাকে, ফিস্টুলার সন্দেহ থাকে, আগের অপারেশনের পর আবার ফিরে আসে, অথবা মলদ্বারের ভেতরের রোগের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না বুঝতে হয়, তখন অতিরিক্ত পরীক্ষা লাগতে পারে।

পাইলোনিডাল সাইনাসের চিকিৎসা

চিকিৎসা নির্ভর করে রোগটি কোন অবস্থায় আছে তার ওপর। শুধু ছোট ছিদ্র আছে? সংক্রমণ হয়েছে? পুঁজ জমেছে? বারবার হচ্ছে? একাধিক সুড়ঙ্গ তৈরি হয়েছে? এগুলোর ওপর চিকিৎসা বদলে যায়।

পাইলোনিডাল সাইনাসের চিকিৎসা

সংক্রমণ না থাকলে প্রাথমিক যত্ন

যদি ব্যথা, পুঁজ বা বড় ফোলা না থাকে, তবে শুরুতে পরিচ্ছন্নতা, চুল নিয়ন্ত্রণ এবং জায়গাটি শুকনো রাখার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। নিয়মিত গোসল, ঘাম হলে জায়গা পরিষ্কার করা, দীর্ঘ সময় বসে থাকার মাঝখানে বিরতি নেওয়া এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ সহায়ক হতে পারে।

abscess না থাকলে pilonidal disease-এর ব্যবস্থাপনায় frequent shaving বা hair removal গুরুত্বপূর্ণ, এবং নির্বাচিত ক্ষেত্রে phenol ব্যবহারের কথাও উল্লেখ আছে।

পুঁজ জমলে

যদি abscess হয়, অর্থাৎ জায়গাটি ফুলে ব্যথা করে এবং পুঁজ জমে, তখন শুধু অ্যান্টিবায়োটিক যথেষ্ট নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ছোট অপারেশনের মাধ্যমে পুঁজ বের করতে হয়। পাইলোনিডাল cyst সাধারণত জায়গাটি অবশ করে ছোট কাটার মাধ্যমে drain করা হয়; বারবার ফিরে এলে সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে।

Drainage করলে ব্যথা দ্রুত কমতে পারে। তবে শুধু পুঁজ বের করলেই সবসময় রোগটি স্থায়ীভাবে শেষ হয় না। কারণ ভেতরের সাইনাস পথ, চুল বা chronic tract থেকে গেলে আবার সমস্যা হতে পারে।

ক্রনিক পাইলোনিডাল সাইনাসের সার্জারি

যদি বারবার পুঁজ হয়, এক বা একাধিক ছিদ্র থাকে, দুর্গন্ধযুক্ত discharge হয় বা রোগটি দীর্ঘদিন থাকে, তখন সাইনাস ট্র্যাক্ট অপসারণের জন্য সার্জারি দরকার হতে পারে।

সার্জারির ধরন কয়েক রকম হতে পারে:

  • সাইনাস কেটে বাদ দিয়ে ক্ষত খোলা রাখা
  • সাইনাস অপসারণ করে ক্ষত সেলাই করে বন্ধ করা
  • flap surgery, বিশেষ করে জটিল বা বারবার ফিরে আসা রোগে
  • minimally invasive technique
  • নির্বাচিত ক্ষেত্রে laser ablation

লেজার চিকিৎসা কি পাইলোনিডাল সাইনাসে কার্যকর?

নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে লেজার পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। লেজার অ্যাবলেশনে সাইনাস ট্র্যাক্টের ভেতরে লেজার energy প্রয়োগ করে পথটি বন্ধ বা সংকুচিত করার চেষ্টা করা হয়। এতে কাটাছেঁড়া তুলনামূলক কম হতে পারে, ব্যথা কম হতে পারে, এবং দ্রুত নিরাময় হতে পারে।

তবে সব পাইলোনিডাল সাইনাসে লেজার উপযুক্ত নয়। বড়, জটিল, বহু শাখাযুক্ত, বারবার অপারেশন হওয়া বা তীব্র সংক্রমিত রোগে অন্য পদ্ধতি দরকার হতে পারে। সঠিক রোগী নির্বাচন এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসার পর কীভাবে যত্ন নিবেন?

চিকিৎসার পর যত্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সার্জারির পর ক্ষতের যত্ন ঠিক না হলে সংক্রমণ, দেরিতে শুকানো বা পুনরায় হতে পারে। তাই চিকিৎসার পর সাধারণভাবে যা মানা দরকার:

  • জায়গাটি পরিষ্কার ও শুকনো রাখা
  • চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী dressing করা
  • দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থাকা
  • ঘাম হলে জায়গা পরিষ্কার করা
  • নিয়মিত follow-up করা
  • প্রয়োজন হলে hair removal চালিয়ে যাওয়া
  • ব্যথা, জ্বর, বেশি পুঁজ বা দুর্গন্ধ হলে দ্রুত জানানো
  • tight পোশাক বা বেশি ঘর্ষণ এড়িয়ে চলা

কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?

পাইলোনিডাল সাইনাসের সমস্যা অনেক সময় ছোট ফোঁড়া বা সামান্য ব্যথা দিয়ে শুরু হলেও সংক্রমণ হলে দ্রুত জটিল হতে পারে। তাই নিতম্বের ভাঁজে ব্যথা, পুঁজ বা বারবার ফোলা দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন যদি—

  • নিতম্বের ভাঁজে ব্যথাযুক্ত ফোলা দেখা দেয়
  • পুঁজ, রক্ত বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বের হয়
  • বসতে, হাঁটতে বা শুতে কষ্ট হয়
  • একই জায়গায় বারবার ফোঁড়া হয়
  • জ্বর বা শরীর খারাপ লাগা শুরু হয়
  • আগের অপারেশনের পর আবার ছিদ্র বা স্রাব দেখা দেয়
  • ডায়াবেটিস বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে
  • সংক্রমণ আশপাশে ছড়িয়ে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়

সঠিক চিকিৎসা নিতে কোলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ নিন

নিতম্বের ভাঁজে বারবার ফোঁড়া, পুঁজ, ব্যথা বা স্রাবের সমস্যা থাকলে সেটি সাধারণ ফোঁড়া ভেবে অবহেলা করা ঠিক নয়। পাইলোনিডাল সাইনাস ঠিকভাবে চিকিৎসা না হলে বারবার ফিরে আসতে পারে এবং দৈনন্দিন জীবনেও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।

ডাঃ তারিক আখতার খান একজন অভিজ্ঞ কোলোরেক্টাল সার্জন। পাইলোনিডাল সাইনাস, পাইলস, ফিস্টুলা, ফিশারসহ মলদ্বার ও কোলোরেক্টাল রোগের নির্ণয় ও চিকিৎসায় তিনি রোগীর অবস্থা অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা দিয়ে থাকেন।

পাইলোনিডাল সাইনাস নিয়ে সাধারণ প্রশ্নোত্তর

সংক্রমণ না থাকলে কিছু সময় লক্ষণ কম থাকতে পারে, কিন্তু chronic sinus থাকলে সাধারণত নিজে নিজে পুরোপুরি সেরে যায় না। বারবার ব্যথা, পুঁজ বা ছিদ্র থাকলে চিকিৎসা দরকার।

সবসময় না। রোগের অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ছোট ও সংক্রমণহীন ক্ষেত্রে পরিচর্যা, চুল নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। কিন্তু abscess, বারবার পুঁজ, chronic discharge বা একাধিক ছিদ্র থাকলে সার্জারি লাগতে পারে।

না। পাইলস মলদ্বারের রক্তনালীর সমস্যা। পাইলোনিডাল সাইনাস সাধারণত নিতম্বের মাঝের ভাঁজে চুল ও সংক্রমণজনিত সমস্যা। জায়গা কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই ভুল করেন।

নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে করা যায়। লেজারে কাটাছেঁড়া কম হতে পারে এবং recovery দ্রুত হতে পারে। তবে জটিল, বড় বা বহু শাখাযুক্ত সাইনাসে অন্য সার্জারি বেশি উপযোগী হতে পারে।

না। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে যেতে পারে এবং ক্ষত আরও খারাপ হতে পারে। ব্যথাযুক্ত ফোলা বা পুঁজ থাকলে চিকিৎসকের মাধ্যমে নিরাপদ drainage করা উচিত।

পদ্ধতির ওপর সময় নির্ভর করে। সেলাই করা ক্ষত তুলনামূলক দ্রুত শুকাতে পারে, আর খোলা ক্ষত রেখে সার্জারি করলে নিয়মিত dressing সহ কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। চিকিৎসকের follow-up খুব গুরুত্বপূর্ণ।

জায়গাটি পরিষ্কার ও শুকনো রাখা, চুল নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘ সময় বসে না থাকা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত follow-up recurrence কমাতে সাহায্য করতে পারে।

সতর্কতাঃ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যসমূহ শুধুমাত্র সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

Call Receptionist
Call for Appointment
Make An Appoinment

Appointment Scheduling Time: 9 AM - 10 PM

  1. Dhanmondi Diagnostic & Consultation Center
  2.  Popular Diagnostic Centre Ltd. Logo
  3. Impulse Hospital
Arrow