আলসারেটিভ কোলাইটিস: লক্ষণ, কারণ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
পেটের সমস্যাকে আমাদের সমাজে অনেক সময় হালকাভাবে দেখা হয়। দীর্ঘদিন পেটব্যথা, পাতলা পায়খানা, মলের সঙ্গে
রক্ত, বা বারবার টয়লেটে যাওয়ার অস্বস্তিকে অনেকে গ্যাস্ট্রিক, আমাশয়, খাবারের সমস্যা, বা পাইলস ভেবে এড়িয়ে
যান।
শুরুতে বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও, অনেক ক্ষেত্রে এর পেছনে আলসারেটিভ কোলাইটিসের মতো
দীর্ঘমেয়াদি অন্ত্রের রোগ থাকতে পারে। এটি হলো বড় অন্ত্রের ভেতরের আস্তরণে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও ক্ষত তৈরি
হওয়া একটি রোগ। এতে মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, বারবার পাতলা পায়খানা, তলপেটে ব্যথা, এবং ঘন ঘন মলত্যাগের তাড়না
দেখা দিতে পারে।
কখনও রোগটি ধীরে ধীরে বাড়ে, আবার কখনও কিছুদিন কমে গিয়ে পরে আবার বাড়ে। মলে রক্ত, দীর্ঘদিন ডায়রিয়া, বা
অস্বাভাবিক পেটের উপসর্গকে হালকাভাবে না নিয়ে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কোলনে আলসারজনিত সমস্যা, আইবিডি, এবং অন্যান্য কোলোরেক্টাল রোগের মূল্যায়নে অভিজ্ঞ
এর তত্ত্বাবধানে সঠিক রোগ নির্ণয় ও পরিকল্পিত চিকিৎসা রোগ নিয়ন্ত্রণে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আলসারেটিভ কোলাইটিস হলো বড় অন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত একটি রোগ, যাতে অন্ত্রের ভেতরে ক্ষত তৈরি হতে
পারে। এতে মলের সঙ্গে রক্ত, ডায়রিয়া, পেটব্যথা, এবং বারবার মলত্যাগের তাগিদ দেখা দেয়। এটি প্রদাহজনিত
অন্ত্রের রোগ বা
Inflammatory Bowel Disease (IBD)-এর একটি ধরন। IBD-এর আরেকটি পরিচিত রোগ হলো
ক্রোনস ডিজিজ।
তবে আলসারেটিভ কোলাইটিস ও ক্রোনস ডিজিজ এক নয়। এটি সাধারণত কোলন ও
রেকটামের ভেতরের আস্তরণে
সীমাবদ্ধ থাকে, আর ক্রোনস ডিজিজ পাচনতন্ত্রের বিভিন্ন অংশে হতে পারে।
আলসারেটিভ কোলাইটিসের লক্ষণ কী কী?
এই রোগের লক্ষণ সব রোগীর মধ্যে এক রকম হয় না। কারও রোগ হালকা থাকে, কারও বেশি সক্রিয় থাকে। আবার প্রদাহ
অন্ত্রের কতটুকু অংশে হয়েছে, তার ওপরও উপসর্গের ধরন বদলাতে পারে। তবে কিছু লক্ষণ খুব বেশি দেখা যায়।
মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া: কোলনে আলসারজনিত সমস্যার অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
কারও ক্ষেত্রে রক্ত কম থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে তা স্পষ্ট দেখা যায়।
পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া: বারবার পাতলা পায়খানা হওয়া এই রোগের খুব সাধারণ উপসর্গ। অনেকের দিনে
কয়েকবার টয়লেটে যেতে হয়, আর কখনও এর সঙ্গে রক্ত, শ্লেষ্মা, বা পুঁজও থাকতে পারে।
পেটব্যথা ও মোচড়ানো অনুভূতি: তলপেট বা পেটের নিচে মোচড়ানো ব্যথা হতে পারে। মলত্যাগের আগে বা পরে এই
ব্যথা বাড়তে পারে।
বারবার টয়লেটে যাওয়ার তাড়না: অনেক সময় সবসময় টয়লেটে যাওয়ার চাপ অনুভূত হয়, যদিও খুব বেশি মল
নাও হতে পারে। এটি এই রোগের পরিচিত লক্ষণ।
মলে শ্লেষ্মা বা পুঁজ: মলের সঙ্গে শ্লেষ্মা আসা, বা কিছু ক্ষেত্রে পুঁজের মতো মিশ্রণ থাকা এই রোগে দেখা
যেতে পারে। এটি অন্ত্রের ভেতরের প্রদাহের একটি লক্ষণ।
দুর্বলতা, ওজন কমে যাওয়া, রক্তশূন্যতা: দীর্ঘদিন রক্তপাত ও ডায়রিয়ার কারণে শরীর দুর্বল হয়ে যেতে
পারে। ক্ষুধা কমা, ওজন কমে যাওয়া, এবং রক্তশূন্যতাও দেখা দিতে পারে।
জ্বর বা শরীর খারাপ লাগা: রোগ খুব সক্রিয় হলে জ্বর, অবসাদ, বা সারাদিন ক্লান্ত লাগতেও পারে। এই
লক্ষণগুলো থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
কোন লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?
সব পেটের সমস্যা জরুরি নয়, তবে কিছু লক্ষণ আছে যেগুলোকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। যেমন:
নোট: এই ধরনের অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরী। কারণ রোগ হঠাৎ বেড়ে গেলে অনেক সময়
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হতে পারে।
আলসারেটিভ কোলাইটিস কেন হয়? প্রধান কারণ সমুহ
আলসারেটিভ কোলাইটিস (Ulcerative Colitis) হওয়ার
সুনির্দিষ্ট বা একমাত্র কোনো কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি
সাধারণত শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, জিনগত প্রবণতা, অন্ত্রের জীবাণুর পরিবর্তন, এবং
কিছু পরিবেশগত কারণে হতে পারে।
১. রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া: সাধারণত রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শরীরকে জীবাণুর
আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু কোলনে আলসারের সমস্যা অনেক সময় এটি ভুলভাবে অন্ত্রের সুস্থ কোষের বিরুদ্ধেই
প্রতিক্রিয়া দেখায়, ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয়।
২. বংশগত বা জিনগত প্রভাব: পরিবারে কারও কোলনের আলসারজনিত সমস্যা বা অন্য কোনো প্রদাহজনক অন্ত্রের রোগ
থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। কিছু মানুষের শরীরে জিনগতভাবেই এই রোগের প্রবণতা বেশি থাকতে পারে।
৩. অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যহীনতা: সুস্থ অন্ত্রে অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা হজম ও
অন্ত্রের স্বাভাবিক কাজ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। এই ভারসাম্যে পরিবর্তন এলে অন্ত্রে প্রদাহ তৈরি বা বাড়তে
পারে।
৪. পরিবেশগত প্রভাব: খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, ও কিছু বাইরের প্রভাব রোগের ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার অন্ত্রের স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে উপসর্গ
বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
মনে রাখা জরুরি: অনেকেই ভাবেন, শুধু মানসিক চাপ বা ঝাল-মসলাযুক্ত খাবারের কারণেই কোলনে আলসারের সমস্যা
হয়। আসলে তা নয়। এগুলো রোগের মূল কারণ নয়, তবে রোগ থাকলে উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে।
আলসারেটিভ কোলাইটিস কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
আলসারেটিভ কোলাইটিস নির্ণয়ের জন্য শুধু একটি উপসর্গ দেখা যথেষ্ট নয়। চিকিৎসক সাধারণত রোগীর উপসর্গ, শারীরিক
অবস্থা, এবং কয়েকটি প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নিশ্চিত করেন।
১. রোগের ইতিহাস নেওয়া
শুরুতে চিকিৎসক রোগীর কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেন। যেমন:
কতদিন ধরে ডায়রিয়া হচ্ছে
মলের সঙ্গে রক্ত যাচ্ছে কি না
রাতে ঘুম থেকে উঠে টয়লেটে যেতে হয় কি না
ওজন কমেছে কি না
পরিবারে IBD-এর ইতিহাস আছে কি না
জ্বর, দুর্বলতা, বা অন্য কোনো উপসর্গ আছে কি না
২. শারীরিক পরীক্ষা: শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসক শরীরের দুর্বলতা, পানিশূন্যতা, পেটে চাপ
দিলে ব্যথা, বা অন্য কোনো জটিলতার লক্ষণ আছে কি না তা দেখেন।
৩. রক্ত পরীক্ষা: রক্ত পরীক্ষায় রক্তশূন্যতা, শরীরে প্রদাহের চিহ্ন, বা সংক্রমণের সম্ভাবনা
সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
৪. স্টুল টেস্ট: স্টুল টেস্টের মাধ্যমে সংক্রমণ, রক্ত, এবং কিছু ক্ষেত্রে অন্ত্রের প্রদাহের
ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংক্রমণজনিত কোলাইটিস ও আলসারেটিভ কোলাইটিস এক জিনিস নয়।
৫. কোলনোস্কোপি বা সিগময়েডোস্কোপি: রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো কোলনোস্কোপি বা সিগময়েডোস্কোপি। এই
পরীক্ষায় চিকিৎসক অন্ত্রের ভেতরের আস্তরণ সরাসরি দেখতে পারেন। এতে কোথায় প্রদাহ আছে, কতটুকু ছড়িয়েছে, এবং
ক্ষত আছে কি না তা বোঝা যায়। অনেক সময় এই পরীক্ষার সময় বায়োপসিও নেওয়া হয়।
৬. বায়োপসি টেস্ট: বায়োপসি হলো অন্ত্রের ভেতর থেকে খুব ছোট টিস্যুর নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা।
এর মাধ্যমে রোগের ধরন আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায় এবং নির্ণয় আরও নির্ভুল হয়।
আলসারেটিভ কোলাইটিসের চিকিৎসা কী?
আলসারেটিভ কোলাইটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এর চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো অন্ত্রের প্রদাহ কমানো, উপসর্গ
নিয়ন্ত্রণে আনা, এবং রোগীকে যতদিন সম্ভব ভালো অবস্থায় রাখা। চিকিৎসা সাধারণত ওষুধের মাধ্যমে শুরু হয়। তবে রোগ
গুরুতর হলে অস্ত্রোপচারও প্রয়োজন হতে পারে।
১.
ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা
বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রথম ধাপ হলো ওষুধ। রোগের তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসক বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দিতে
পারেন।
অ্যামিনোস্যালিসিলেটস: মৃদু থেকে মাঝারি রোগে প্রদাহ কমাতে এই ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
কর্টিকোস্টেরয়েড: উপসর্গ হঠাৎ বেড়ে গেলে দ্রুত প্রদাহ কমানোর জন্য স্বল্প সময়ের জন্য স্টেরয়েড
দেওয়া হতে পারে।
ইমিউনোমোডুলেটর: কিছু ক্ষেত্রে শরীরের অতিরিক্ত প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া কমাতে এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা
হয়।
বায়োলজিক ওষুধ: মাঝারি থেকে গুরুতর রোগে কিছু রোগীর জন্য আধুনিক biologic therapy প্রয়োজন হতে পারে।
নতুন ধরনের ট্যাবলেটভিত্তিক চিকিৎসা: অন্য চিকিৎসায় পর্যাপ্ত উপকার না হলে কিছু নতুন ওষুধ বিবেচনা করা
হতে পারে।
২.
খাবার ও জীবনযাপনে সতর্কতা
খাবার দিয়ে এই রোগ পুরোপুরি ভালো করা যায় না, তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
যেসব খাবারে গ্যাস বা ডায়রিয়া বাড়ে, সেগুলো এড়িয়ে চলা
দুধ বা দুগ্ধজাত খাবারে সমস্যা হলে সতর্ক থাকা
রোগের উপসর্গ-এর সময় আঁশযুক্ত খাবার কম খাওয়া
অল্প অল্প করে কয়েকবার খাওয়া
পর্যাপ্ত পানি পান করা
৩.
অস্ত্রোপচার
সব রোগীর অস্ত্রোপচার লাগে না। তবে ওষুধে কাজ না হলে, জটিলতা দেখা দিলে, বা রোগ খুব গুরুতর হলে সার্জারির
প্রয়োজন হতে পারে।
৪.
সহায়ক যত্ন
ওষুধের পাশাপাশি বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, মানসিক চাপ কমানো, এবং নিয়মিত ফলো আপ খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোনো
সাপ্লিমেন্ট বা ঘরোয়া উপায় শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আলসারেটিভ কোলাইটিস, ক্রোনস ডিজিজ, IBS, আর আমাশয় কি এক?
না, এগুলো এক নয়। অনেকেই উপসর্গ মিল দেখে একটিকে আরেকটির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু বাস্তবে এদের কারণ,
প্রভাব, এবং চিকিৎসা একেবারেই আলাদা। কোলনের আলসারজনিত সমস্যা হলো বড় অন্ত্রের প্রদাহজনিত একটি রোগ। এতে
সাধারণত মলে রক্ত, ডায়রিয়া, পেটব্যথা, এবং বারবার টয়লেটে যাওয়ার তাড়না দেখা যায়।
ক্রোনস ডিজিজ-ও IBD-এর একই ধরন, তবে এটি শুধু বড় অন্ত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। মুখ থেকে পায়ুপথ
পর্যন্ত পাচনতন্ত্রের বিভিন্ন অংশে এই রোগ হতে পারে, এবং প্রদাহও তুলনামূলক গভীর স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
IBS বা irritable bowel syndrome-এ পেটব্যথা, গ্যাস, পেট ফাঁপা, এবং মলত্যাগের স্বাভাবিক নিয়মে পরিবর্তন দেখা যায়। তবে এটি আলসারেটিভ
কোলাইটিসের মতো প্রদাহজনিত রোগ নয়। IBS-এ সাধারণত অন্ত্রে আলসার বা রক্তপাত দেখা যায় না।
আমাশয় বা অন্ত্রের সংক্রমণেও ডায়রিয়া, পেটব্যথা, এমনকি কখনও রক্তমিশ্রিত মল হতে পারে। তাই শুধু উপসর্গ
দেখে নিজে নিজে রোগ নির্ধারণ করা ঠিক নয়। সঠিক কারণ জানতে প্রয়োজন হয় চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয়
পরীক্ষা।
কোলনে আলসার হলে কি পুরোপুরি সেরে যায়?
কোলনের আলসারজনিত সমস্যা পুরোপুরি সেরে যায় কিনা প্রশ্নটি প্রায় রোগীরাই করেন। বাস্তব কথা হলো, এটি সাধারণত
দীর্ঘমেয়াদি রোগ। অনেক রোগী চিকিৎসার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ভালো থাকেন, উপসর্গ কমে যায়, স্বাভাবিক জীবনও কাটান।
কিন্তু রোগটি flare-up এবং remission-এর ধাপে ধাপে চলতে পারে। তাই “উপসর্গ কমে গেছে মানেই আর কোনো চিকিৎসা লাগবে
না”—এমন ভাবা ঠিক নয়।
রোগের নিয়ন্ত্রণই এখানে মূল কথা। সঠিক ফলোআপ, ওষুধ ঠিকমতো নেওয়া, সতর্কীকরণ চিনে রাখা, এবং চিকিৎসকের পরামর্শ
মানা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কোলনে আলসার হলে কী কী জটিলতা হতে পারে?
কোলনের আলসারজনিত সমস্যা শুধু পেটের অস্বস্তি তৈরি করে না; দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকলে কিছু জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
রক্তশূন্যতা: দীর্ঘদিন রক্তপাত হলে রক্তশূন্যতা হতে পারে। এতে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, এবং ক্লান্তি
বাড়ে।
পানিশূন্যতা: ঘন ঘন ডায়রিয়ার কারণে পানিশূন্যতা হতে পারে।
পুষ্টিহীনতা ও ওজন কমে যাওয়া: দীর্ঘদিন অসুস্থতা, ক্ষুধামন্দা, এবং বারবার পায়খানার কারণে শরীর
দুর্বল হয়ে যায়। অনেকের ওজনও কমে যেতে পারে।
গুরুতর কোলন সমস্যা: প্রদাহ খুব বেশি হলে কোলনে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। গুরুতর রক্তপাত-এর মতো
প্রভাবও ফেলতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি: যাদের বহু বছর ধরে কোলনের আলসারজনিত সমস্যা আছে, বিশেষ
করে রোগ বেশি অংশজুড়ে বা দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকলে, তাদের কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি
কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।
আলসারেটিভ কোলাইটিসে কী কী সতর্কতা দরকার?
কোলনের আলসারজনিত সতর্কতার মূল কথা হলো—উপসর্গকে হালকাভাবে না নেওয়া, নিয়মিত চিকিৎসকের ফলো-আপে থাকা, এবং যেসব
কারণে উপসর্গ বাড়ে সেগুলো চিনে রাখা। রোগটি দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় শুধু ওষুধ খেলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; খাবার,
পানি, বিশ্রাম, এবং রোগের উপসর্গ-এর লক্ষণ বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
১. ওষুধ নিজের ইচ্ছামতো বন্ধ করবেন না: উপসর্গ কমে গেলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা ঠিক
নয়। এতে রোগ আবার বেড়ে যেতে পারে।
২. মলে রক্ত, ডায়রিয়া, বা পেটব্যথা বাড়লে দ্রুত জানাবেন: মলের সঙ্গে রক্ত বাড়া, দিনে অনেকবার পাতলা
পায়খানা, বা পেটব্যথা বেড়ে যাওয়া রোগের উপসর্গ এর লক্ষণ হতে পারে। গুরুতর হলে হাসপাতালে চিকিৎসাও লাগতে
পারে।
৩. পানিশূন্যতা এড়াতে পর্যাপ্ত পানি পান করুন: বারবার ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে
যায়। তাই পানি কম খাওয়া ঠিক নয়।
৪. যেসব খাবারে উপসর্গ বাড়ে, সেগুলো এড়িয়ে চলুন: দুধ, খুব তৈলাক্ত খাবার, বা কিছু উচ্চ-ফাইবার খাবার
অনেকের ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়াতে পারে, বিশেষ করে রোগের উপসর্গ-এর সময়। তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া খেয়াল
রাখা দরকার।
৫. অল্প অল্প করে কয়েকবার খান: একবারে বেশি না খেয়ে ছোট ছোট মিল নিলে অনেক সময় পেটের চাপ কম হয়।
NHS এই ধরনের খাদ্যাভ্যাসকে সহায়ক বলে উল্লেখ করে।
৬. পুষ্টির দিকে নজর রাখুন: দীর্ঘদিন রোগ থাকলে ওজন কমা, দুর্বলতা, বা পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে। খাবার
খুব সীমিত হয়ে গেলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদ-এর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
৭. মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন: স্ট্রেস এই রোগের একমাত্র কারণ নয়, তবে রোগের উপসর্গ বাড়াতে
ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বিশ্রাম, নিয়মিত ঘুম, এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।
৮. গুরুতর লক্ষণ দেখলে দেরি করবেন না: অতিরিক্ত রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, জ্বর, খুব বেশি দুর্বলতা, বা
খাওয়া-দাওয়া করতে না পারলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।
রোগীরা সাধারণত যে ভুলগুলো করেন
কোলনের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহে রোগ নির্ণয় দেরি হওয়ার পেছনে কিছু সাধারণ ভুল থাকে। এই ভুলগুলোর কারণে রোগ ভেতরে
ভেতরে বাড়তে পারে। যেমন:
কোলনের আলসার, ক্রোনস ডিজিজ, আইবিডি, এবং অন্যান্য কোলোরেক্টাল সমস্যার মূল্যায়ন ও চিকিৎসায়
বাংলাদেশের অভিজ্ঞ কোলোরেক্টাল সার্জনদের একজন। তিনি MBBS, FCPS, MS, এবং FRCS ডিগ্রিধারী;
কোলোরেক্টাল রোগ নিয়ে তাঁর ১৬ বছরের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তিনি রোগ নির্ণয়, আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, ও রোগীকেন্দ্রিক পরামর্শের জন্য সুপরিচিত।
আলসারেটিভ কোলাইটিস: অবহেলা নয়, সময়মতো চিকিৎসাই সুরক্ষা
এটি এমন একটি রোগ, যাকে অবহেলা করলে এটি দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির কারণ হতে পারে। কিন্তু সুখবর হলো, সঠিক সময়ে
রোগ ধরা পড়লে এবং পরিকল্পিত চিকিৎসা শুরু হলে অনেক রোগীই ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারেন।
তাই মলে রক্ত, দীর্ঘদিন পাতলা পায়খানা, পেটের মোচড়ানো ব্যথা, বা টয়লেটে যাওয়ার অস্বাভাবিক তাড়নাকে হালকা
করে দেখবেন না। নিজে নিজে অনুমান না করে সঠিক পরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
অন্ত্রের রোগে দেরি করার চেয়ে দ্রুত স্পষ্ট হওয়া সবসময় ভালো। আর চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয়
হলো—সঠিক রোগ নির্ণয়, নিয়মিত ফলোআপ , এবং ধৈর্য ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া।
কোলনের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ নিয়ে রোগী ও পরিবারের মনে রোগটি কেন হয়, কীভাবে ধরা পড়ে, কী চিকিৎসা হয়, আর
দীর্ঘদিন থাকলে কী কী সতর্কতা দরকার প্রশ্ন থাকে। নিম্নে আমরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় সহজে তুলে ধরেছি, যাতে
রোগটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
আলসারেটিভ কোলাইটিস হলো বৃহদান্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ। এতে কোলনের ভেতরের আস্তরণে প্রদাহ ও ছোট ঘা তৈরি হতে পারে। ফলে পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা, রক্ত বা মিউকাসসহ পায়খানা, এবং বারবার টয়লেটে যাওয়ার চাপ দেখা দিতে পারে।
এর সঠিক কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, পারিবারিক ইতিহাস, পরিবেশ, খাবারের ধরন, মানসিক চাপ ও অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য পরিবর্তন—এসব বিষয় ঝুঁকি বা উপসর্গ বাড়াতে পারে।
সাধারণ লক্ষণের মধ্যে আছে মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, পাতলা পায়খানা, পেট মোচড়ানো বা ব্যথা, এবং মলে
শ্লেষ্মা আসা। কারও কারও দুর্বলতা ও ওজনও কমে যেতে পারে।
না, সবসময় নয়। পাইলস, মলদ্বারের ফাটল, সংক্রমণ, বা বৃহদান্ত্রের অন্য রোগের কারণেও মলে রক্ত যেতে পারে।
তাই সঠিক কারণ জানতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা জরুরি।
না, এটি সাধারণত সংক্রামক রোগ নয়। একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে সাধারণ সংস্পর্শে এই রোগ ছড়ায় না।
একজনের জন্য যা সহনীয়, আরেকজনের জন্য তা নাও হতে পারে। তাই flare-up-এর সময় হালকা ও সহনীয় খাবার খাওয়া
এবং কোন খাবারে উপসর্গ বাড়ে তা নোট করা উপকারী।
খুব ঝাল, অতিরিক্ত তৈলাক্ত, কিছু high-fiber খাবার, বা যেসব খাবারে ব্যক্তিগতভাবে সমস্যা বাড়ে, সেগুলো
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কমানো ভালো। তবে সবার জন্য এক তালিকা একরকম হয় না।
দীর্ঘদিন রোগ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে বা অনেক বছর ধরে এই সমস্যা চলতে থাকলে বৃহদান্ত্র-সম্পর্কিত জটিলতার
ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত ফলোআপ ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মলে বেশি রক্ত গেলে, তীব্র পেটব্যথা হলে, দীর্ঘদিন ডায়রিয়া থাকলে, দুর্বলতা বেড়ে গেলে, বা জ্বর ও
পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সতর্কতাঃ
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যসমূহ শুধুমাত্র সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
Struggling with ulcerative colitis? Get effective ulcerative colitis treatment in Bangladesh with Dr. Tariq Akhtar Khan. Schedule your appointment now!